মেনু নির্বাচন করুন

ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিনের বসত ভিটা

মুনশী রইস  উদ্দিন (১৯০১-১৯৭৩)
Munsi Rais Uddin (1901-1973)

 

http://jessore.info/master/content_img/admin/images/Persons%20pic/PP%20Size%20photo/munsi_rois_uddin.jpgজন্ম পরিচয়:

বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে ক্ষণজন্মা যে কজন ব্যক্তিকে নিয়ে গর্ব করা যায় ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিন তাদের মধ্যে প্রথম সারির একজন ব্যক্তিত্ব। সংগীতের জগতে অনন্য সৃজনশীলতার সুদীর্ঘ পথ ধরে এই ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। ধ্রুপদী সংগীতের অনন্য ব্যক্তিত্ব, উচ্চাঙ্গ কণ্ঠশিল্পী ও প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন মুনশী রইস উদ্দিন। তিনি ১৯০১ সালের ১০ জানুয়ারি এবং ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ২৩ পৌষ (২৪ পৌষ), শুক্রবার তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলা বর্তমান মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের নাকোল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুনশী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুনশী আব্বাস উদ্দিন এবং মাতার নাম জোবেদা খাতুন।

 


শিক্ষা ও কর্মজীবন :

 

সুকণ্ঠের অধিকারী মুনশী রইস উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সংগীত প্রতিভার বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহের কারণে লেখাপড়া ওখেলাধুলার চেয়ে সংগীতচর্চার দিকেই তাঁর প্রবল ঝোঁক ওউৎসাহ দেখা যায়। পিতার  ধ্রুপদী ও টপ্পাচর্চা শুনে শুনেই নিজেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে শুরু করেন ভবিষ্যত জীবনেরধ্রুপদী সংগীতের এক অনুরাগী হিসেবে । পিতার অজান্তে ফুপাতো ভাই তৎকালীন বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী শামসুল হকের নিকট তাঁর প্রথম সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয়।  মেধাবীছাত্র হিসেবে এবং সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে স্কুল শিক্ষকদের কাছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুখে মুখে যে সব গান শিখতেন, সেগুলো নিজে নিজেই হারমোনিয়ামে তোলার চেষ্টা করতেনতিনি। পাশাপাশি স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন সংগীত অনুষ্ঠানে গান শোনা এবং সংগীত পরিবেশন ছিল তাঁর স্বভাবজাতপ্রবৃত্তির অংশ।

 

১৯১৭ সালে সাংসারিক বাধ্যবাধকতার গণ্ডী থেকে বের হয়ে লেখাপড়া ও পারিবারিক বন্ধন ছেড়ে শুধু সংগীতের সুরের টানে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ছুটে যান সংগীতের প্রাণকেন্দ্রকলকাতায়। প্রখ্যাত সংগীত সাধক নুলো গোপাল বাবুর প্রধান শিষ্য রাস বিহারী মল্লিকের কাছে প্রায় ১২ বছর ধ্রুপদী ও খেয়ালের তালিম নিতে শুরু করেন তিনি । কিন্তু, আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর কলকাতার সংগীত শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। এই সংকট মোচনের জন্যতিনি ‘ওয়েলম্যান স্টোরে’ সাতাশ টাকা বেতনে সেল্‌সম্যানের চাকুরীগ্রহণ করেন। এখানে এক বিদেশী ষোড়শীর সাথে তাঁর প্রণয় ঘটে। পরবর্তীতে ব্যর্থ প্রেমের কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করলে কয়েক বছর পর মনোকষ্ট নিয়ে পিতার ডাকে তিনি গ্রামে ফিরে আসেন।

মুনশী রইস উদ্দিন আর্থিক সংকটের কারণে প্রথমেকুষ্টিয়া মিলে চাকুরী গ্রহণ করেন। সংগীতের প্রসারকল্পে এ সময় তিনি কুষ্টিয়ায় একটি সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরে তিনি মাগুরা, নড়াইল ও খুলনাতেও অনুরূপ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্যে তাঁর সাধক মন ব্যাকুল হয়ে উঠলে পুনরায় তিনি কলকাতা ছুটে যান সুরের সন্ধানে। প্রখ্যাত সঙ্গীতবিদ পণ্ডিত গিরিজা শংকর চক্রবর্তীর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত সংগীত কলাভবনে ভর্তি হয়ে প্রথমে তাঁর ভাগ্নে শ্রী যামিনী গাংগুলী (ডক্টর অফ মিউজিক)-র কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিতে শুরু করেন। পাশাপাশি গুরু গিরিজা শংকরের কাছ থেকেও সংগীতের পাঠ নিয়ে অতি অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৮ সালেওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিন ছদ্মনামে আর মুনশী অর্থাৎ রবিন মুনশী নামে প্রথম কলকাতা বেতারে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ লাভ করেন। সংগীত কলাভবনে দীর্ঘদিন শিক্ষালাভের পর ১৯৪২ সালে তিনি সম্মানসূচক সার্টিফিকেট লাভ করেন। তিনি লক্ষ্ণৌর সঙ্গীতবিশারদ শরজিৎ কাঞ্জিলালের নিকটও কিছুকাল  সঙ্গীত শেখেন।

 

দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকা বেতারে শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন এবং নারায়ণগঞ্জে স্থায়ীভাবেবসবাস শুরু করেন। তাঁরই উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জে ‘প্রবেশিকা সঙ্গীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি তার অধ্যক্ষপদে বৃত হন। ১৯৫৫ সালের ১লা জুলাই তিনি দেশের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে একাডেমীর সহঅধ্যক্ষ এবং ১৯৬৪ সালে অধ্যক্ষের পদ অলঙ্কৃত করেন। তিনিদীর্ঘ দিন (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত)এখানকার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এ অঞ্চলে সঙ্গীতের প্রসারকল্পে তিনি বিভিন্ন স্থানে সঙ্গীত বিদ্যালয়প্রতিষ্ঠা করেন।

                  

 

                                                                      

 

 

 

                            

 

 

 

 

                       

                   ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিনের বসত ভিটা ও বাড়ির প্রবেশদ্বার।

 

 

পারিবারিক পরিচিতি :

 

ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিনের স্ত্রীর নাম হাজী বেগম আলেয়া খাতুন (সমাজসেবী)। তিনি তিন পুত্র ও এক কন্যার গর্বিত পিতা ছিলেন।

 

সন্তানদের পরিচিতিঃ

 

১। এ, এফ, এম, আলিমুজ্জামান (এম, এ) বেতার শিল্পী ও মিউজিক ডিরেক্টর শিল্পকলা একাডেমীর সংগীত পরিচালক ২। শাহিনা সুলতানা (বেবী) (বি, এ), বেতার শিল্পী ও অধ্যক্ষা- ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিন সংগীত বিদ্যালয়, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা ৩। এ, এফ, এম, আছাদুজ্জামান, (এম, এ, এম, বি, এ) বেতার শিল্পী ৪। ডঃ এ, এফ, এম আশিকুজ্জামান (টুলু) বেতার ও ব্যান্ড শিল্পী ও আর্ক ব্যান্ড লিডার এবং সহকারী পরিচালক, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

 

 

 

 

 

 

 

সৃষ্টকর্ম :

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রসার, সঙ্গীত সম্পর্কে জনগণের উৎসাহ সৃষ্টি এবং নতুন নতুন ছাত্র তৈরি করা ছিল ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিন  জীবনের লক্ষ্য। তিনি ছিলেন নব নব রাগ সৃষ্টিকারী এক অনন্য সংগীত গুরম্ন ও একাধিক সংগীত গ্রন্থের প্রণেতা। বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলায়সঙ্গীত বিষয়শিক্ষাপাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলে তিনি সঙ্গীত বিষয়েঅনেক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ১৯৪০ সালে তিনি ‘সরল সঙ্গীতসার’ নামে সংগীতগ্রন্থের একটি পান্ডুলিপি এবং ‘সংগীত শিক্ষা পদ্ধতি নামে আরেকটি গ্রন্থের পান্ডুলিপি প্রণয়ন করেন।১৯৬০ সালে বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষার জন্যে তাঁর রচিত ‘প্রবেশিকা সংগীতশিক্ষা পদ্ধতি’ গ্রন্থটি টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ও প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, বোর্ড কর্তৃপক্ষ যখন পত্রিকার মাধ্যমে সংগীত বিষয়ক পান্ডুলিপি দাখিল করার জন্য অনুরোধ জানায়তখন তিনি তার প্রবেশিকা সংগীত শিক্ষা পদ্ধতি পান্ডুলিপি যথাসময়ে বোর্ডে দাখিল করেন। ১৯৬০ সালে তাঁর পান্ডুলিপিই একমাত্র বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে খ্যাতি অর্জনকৃত এবং পদক প্রাপ্ত সংগীত বিষয়ক তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ১) ছোটদের সা-রে-গা-মা ২) অভিনব শত রাগ ৩) সংগীত পরিচয় (বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ৭ম শ্রেণির পাঠ্য পুস্তক) ৪) রাগ লহরী  ৫) গীত লহরী (বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ৯ম ও ১০ম শ্রেণির পাঠ্য পুস্তক) ৬) প্রবেশিকা সংগীত শিক্ষা পদ্ধতি (৯ম, ১০ম শ্রেণির অনুমোদিত পাঠ্য পুস্তক) উল্লেখযোগ্য।

ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিনের সংগীত জীবনের শ্রেষ্ঠ পরিচয় অভিনব রাগ রচয়িতা রূপে। সংগীতের সমগ্র ইতিহাসে রাগ রচয়িতায় এরকম নাম অতি অল্পই পাওয়া যায়। গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি তিনি বহু নতুন রাগরাগিণীও সৃষ্টি করেন। এই খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ পদ্মাবতী নামে একটি ‘রাগ’ সৃষ্টি এবং অভিনব শতরাগসহ প্রায় সহস্র গীত বন্দেশ রচনা করেছেন। এ সব বন্দেশে রয়েছে ধ্রুপদ, খেয়াল, লক্ষণগীতি, রাগ দোহা ও ঠুমরীর সমাহার। এছাড়া তাঁর উত্তরসুরী ভবিষ্যতের সংগীত পিপাসুদের জন্য ‘আলম পিয়া’ ছদ্ম নামে অসংখ্য প্রায় ৩৫৭ টি রাগ ভিত্তিক গান সৃষ্টি করেছেন। সংগীত জগতের এ গুণী বরেণ্য প্রবাদ পুরুষএক স্মরণযোগ্য সুরের মায়াজাল সৃষ্টিসহ অসংখ্য শিষ্য ও সংগীত শিল্পী সৃষ্টি করে গেছেন। এভাবে তিনি সঙ্গীতের প্রসার ও উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

 

কবি গোলাম মোস্তফা ওস্তাদজীর স্কুল শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে ওস্তাদ মুনশী রইস উদ্দিন কবি সাহেবের সংগীত শিক্ষক ছিলেন। শুধু তাই নয় এই উপমহাদেশের বহু খ্যাতনামা ও দেশ বরেণ্য সংগীত শিল্পী ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দীনের কাছে সংগীত শিখেছেন। তাদের মধ্যে ভারতের শিল্পী ইলাবমুসুু, শিপ্রা দাস, বাংলাদেশের সানজিদা খাতুন, ফেরদৌসী রহমান, বেদার উদ্দিন আহমেদ, মিলিয়া আলী, লতিফা চৌধুরী সহ বিভিন্ন খ্যাতিমান শিল্পীর নাম উল্লেখযোগ্য। আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী মুনশী রইস উদ্দিন সংগীতের প্রতি অনুরক্ত থেকেও ইসলামি অনুশাসনের জীবনযাপনে ছিলেন পরিপূর্ণ আন্তরিক ও অভ্যস্তএক মানুষ।

 

শিল্পী জীবনের স্বীকৃতি :

 

গবেষণামূলক সঙ্গীতগ্রন্থ ‘অভিনব শতরাগ’ রচনার জন্যে ১৯৬৬ সালে তিনি ‘দাউদ সাহিত্য পুরস্কার’/ ‘আদমজী পুরস্কার’ লাভ করেন। সংগীত গবেষণার জন্যে এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরল অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৬৭ সালে তাঁকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রেসিডেন্টস্বর্ণপদক ‘প্রাইড অফ পারফরমেন্স’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৫ সালে /১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদকে’-র রাষ্ট্রীয় সম্মানেও(মরণোত্তর) ভূষিত হন এ গুণী শিল্পী।

 

 

 

জীবন অবসান:

 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অবর্ণনীয় অনিয়ম ও কষ্ট ভোগের কারণে ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো ভীষণঅসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী হন মুনশী রইস উদ্দিন। নিভুপ্রায় জীবনের দীপ শিখা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বেদনার শোকাবহ মূর্ছনা। সুবিশাল সংগীত কর্মজীবনের যাত্রা শেষ হয়ে এলো ঢাকায় ১৯৭৩ সালের১১ এপ্রিল বাংলা ১৩৮০ সালের ২৮ চৈত্র। পরলোকের পারাবারে পাড়ি জমালেন গুণী ওস্তাদ সুরশিল্পী মুনশী রইস উদ্দিন। কক্ষলোক থেকে বিচ্যুত হলো এক সংগীত নক্ষত্রের। ঢাকার আজিমপুর নতুন গোরস্থানে ঢুকে হাতের ডানে এক নাতিদীর্ঘ ঝাকড়া কদম গাছের ছায়ায় তাকে সমাহিত করা হয়।

 

সম্পাদনা: মোঃ মঈনুল হাসান

উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শ্রীপুর, মাগুরা।

 

তথ্য সূত্র :

 

কাজী শওকত শাহী, যশোরের যশস্বী, শিল্পী ও সাহিত্যিক লেখক

আবু বাসার আখন্দ, সাংবাদিক, মাগুরা।

 

 

 

 

কিভাবে যাওয়া যায়:

শ্রীপুর উপজেলা হতে গ্রাম বাংলা, অটো ভ্যান, মোটর বাইক বা অন্য কোন যানবাহনে নাকোল ইউনিয়নের নাকোল গ্রামে যাওয়া যায়।


Share with :

Facebook Twitter